বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ ডেস্ক : দেশে সাম্প্রতিক সময়ে খুন-অপহরণের মত অপরাধের ঘটনা ‘অনেক’ ঘটলেও পরিস্থিতির ‘স্ট্যাটিসটিক্যালি অবনতি হয়নি’ বলে মন্তব্য করেছেন মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের স্টাফ কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার খান। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক ধরনের ’অনিশ্চয়তা’ থাকলেও সব অপরাধের ঘটনা সেনাবাহিনীর ‘নজরে’ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সম্পূর্ণ নির্মূল’ করতে না পারলেও বাড়তে না দেওয়ার প্রয়াস ‘অব্যাহত’ রয়েছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) ‘দেশের আইনশৃংখলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা’ দিতে সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন মন্তব্য করেন। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার বলেন, “এটা খুবই সাম্প্রতিক, তদন্তটা হলে আমরা বলতে পারব অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কারণটা কী ছিল। এটা কি অ্যাক্সিডেন্ট না কি কেউ করেছে। “আমাদের সচিবালয়ের কাছে সেনাবাহিনীর সদস্য যারা আছেন তারা সার্বক্ষণিক ডেপ্লয়েড থাকে। যখন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তখন ইমিডিয়েট ডেপ্লয়েড করেছে। ফায়ার সার্ভিসকে সর্বাত্মক সহায়তা করেছে।” সচিবালয়ে আগুনের পর ‘গুরুত্বপূর্ণ’ অন্য কোনো স্থাপনায় ‘ঝুঁকি’ রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “সচিবালয়ের আগুনের ঘটনাটা একদম কেবলই ঘটেছে। এটার ব্যপারে ডিটেইলস আমরা এখনও পাইনি, পেলে আমরা বলব। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কেপিআই এর নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই আমাদের দায়িত্বভুক্ত। যখন থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছে তখন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কেপিআইর সাথে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সাথে সমন্বয় করে প্রত্যেকটা হুমকি পর্যালোচনা করা হয় এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে বুধবার মধ্যরাতে রাত ১টা ৫২ মিনিটে আগুনের খবর পেয়ে একে একে নিয়ন্ত্রণে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিসের ১৯ টি ইউনিট। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২ টায় পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা এই আগুনে সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের ৬, ৭, ৮, ৯ এই চারটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এর আগে গত ১৩ ও ২৮ নভেম্বর দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করেছে সেনাসদর। গত ২৯ নভেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই চার সপ্তাহে সেনাবাহিনী ২৮টি অবৈধ অস্ত্র এবং ৪২৪ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। এই সময়ে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ৬৭টি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা রেখেছে সেনাবাহিনী। শিল্পাঞ্চল ছাড়াও গত এক মাসে ৪৫টি বিভিন্ন ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এক মাসে ২০০ মাদক কারবারীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৪০৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথবাহিনীর সদস্যরা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গত ২০ জুলাই থেকে মাঠে থেকে কাজ করছে সেনাবাহিনী। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদবির কর্মকর্তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়েছে সরকার। এই সময়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর ১২৩ জন সদস্য হতাহত হয়েছে। মারা গেছেন একজন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাওয়া হলে কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার খান বলেন, পরিসংখ্যানগতভাবে অবনতি হয়নি। তবে অনেক ঘটনা ঘটছে। যা আমাদের নজরদারিতেও আছে। পুলিশ কাজ করছে। আমরাও কাজ করছি। এলাকাভেদে আমাদের সমন্বয় সেল আছে। যেখানে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিতভাবে সমন্বয় করে। সেনাসদর পর্যায়ে এবং উপদেষ্টামণ্ডলী পর্যায়ে এই সমন্বয় হয়।
সেনাবাহিনী দুই ধরনের অপারেশন চালাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব হুমকি উঠে আসে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী কী হবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং কার্যক্রম গ্রহণ হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ কাজ করছে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে যারা আছেন তারাও কাজ করছে। সাধারণত দুই ধরনের অপারেশন করা হয়। কিছু টার্গেটেড, যেখানে আমরা তথ্য পাই। সেসব তথ্য নিয়ে কিছু অ্যারেস্ট করা হয়েছে। এর বাইরে অনেক সময় ঘটনার রিপোর্ট আমরা পাই, সেখানেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ ধরনের অপারেশনে ঢাকা থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পারবো কি না, তা আমরা বলি না। কিন্তু একটা সহনশীল পর্যায়ে রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা রয়েছে।
সেনাবাহিনী আরও কতদিন মোতায়েন থাকবে জানতে চাইলে ইন্তেখাব হায়দার বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন হয়েছে সরকারের সিদ্ধান্তে। সরকারের সিদ্ধান্তেই প্রত্যাহার করা হবে। কতদিন থাকা দরকার সেটার বিচার সরকার করবে।
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, “পরিস্থিতির অনেক ধরনের আনসার্টেনিটি আছে, আমরা সেগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সাথে মিলেই কাজ করে যাচ্ছি। যাতে করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা সহনশীল পর্যায়ে থাকে।”
সেনাবাহিনীর ‘ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার’ থাকার পরও গত এক-দেড় মাসে খুন-গুম-অপহরণ বেড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার বলেন, “স্ট্যাটিসট্যাকিলি অবনতি হয়নি। হ্যাঁ অনেক ঘটনা ঘটছে, আমাদের নজরদারিতেও আছে। এটার বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে, আমরা কাজ করছি।
“আমাদের বিভিন্ন লেভেলে বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক সমন্বয় সেট আছে যেখানে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যারা আছে তারা একসাথে সমন্বয় করে রেগুলার সেনাসদর পর্যায়ে এবং উপদেষ্টামণ্ডলি পর্যায়ে এই কোঅর্ডিনেশনগুলো হয়। দেশে যত ধরনের আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন ধরনের হুমকিগুলো উঠে আসে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তী পদক্ষেপ কী নেওয়া হবে কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।”
অগ্রিম তথ্যের ভিত্তিতে ‘অপারেশন’ ও মাঠপর্যায়ে ঘটনার তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “এরকম অনেকগুলো চক্র বা অপরাধীদের রিসেন্টলি, স্পেশালি ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পারব কি না জানি না, তবে মাত্রা যাতে না বেড়ে যায় এ বিষয়ে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।”
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন জোরদার হলে সারাদেশে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর কারফিউ তোলা হলেও বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সেনা সদস্যদের মাঠ পর্যায়ে রেখে দেওয়া হয়। অবনতি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের ৬০ দিনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেয় সরকার। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রথম দফায় বিশেষ এ ক্ষমতা দেওয়ার নির্ধারিত দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার আগেই গত ১৬ নভেম্বর সময় আরও দুই মাস বাড়ানো হয়।
বৃহস্পতিবার গত চার সপ্তাহে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের পরিসংখ্যান তুলে ধরার এ সংবাদ সম্মেলনে ‘মাঠপর্যায়ে আর কতদিন থাকবে’ সেনাবাহিনী এমন প্রশ্নের জবাবে কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার বলেন, “কতদিন দায়িত্ব পালন করব এটার বিষয়ে ইতোপূর্বে আমি একবার বলেছি। সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে সরকারের সিদ্ধান্তে। সরকারের সিদ্ধান্তেই সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।”
মাঠপর্যায়ে টানা কাজের ‘চাপ’ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটা সহজ না, বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্যই বিভিন্ন ধরনের হুমকি আছে। কিন্তু চাপ বলতে আমরা যেটা বুঝি সেনাবাহিনীর যে রুটিন প্রশিক্ষণ, এটা চাপ নেওয়ার জন্যই আমাদের প্রশিক্ষিত করা হয়। সেক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো চাপ আমাদের নেই।
“তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতির অনেক ধরনের আনসার্টেনিটি আছে, আমরা সেগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সাথে মিলেই কাজ করে যাচ্ছি। যাতে করে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা সহনশীল পর্যায়ে থাকে।”
চাঁদাবাজি বাড়ার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ তালিকা করেছে, এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে আমরা আলাদা কোনো তালিকা নিয়ে কাজ করছি না। তালিকা একটাই সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।”
মামলার হুমকি দিয়ে কিংবা মামলা থেকে নাম কাটাতে ‘বাণিজ্য’ বিষয়ক প্রশ্নে মিলিটারি অপারেশনস ডাইরেক্টরেটের এই স্টাফ কর্নেল বলেন, “চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো এ ধরনেরই হয়। বিভিন্ন প্রকারের চাঁদাবাজি হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে বা পুলিশের কাছে আসলে অবশ্যই প্রত্যেকটা খতিয়ে দেখা হয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিষয়টি আমাদের নজরদারিতে আছে।”
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশসহ সার্বিক পরিস্থিতিতে কোনো ‘ঝুঁকি’ রয়েছে কি না জানতে চাইলে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “দেশের সার্বভৌমত্বের নিরাপত্তার ঝুঁকি আমরা এই মুহূর্তে ওইরকম তেমন কিছু দেখছি না। কিন্তু আমাদের কক্সবাজার জেলায় যারা আছেন তারা সবসময় তৎপর আছেন। আমাদের সাথে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, বিজিবি, সরকারের অন্যান্য সংস্থা যারা কাজ করছেন সবার সাথে সমন্বয় আছে। যদি কোনও ধরনের ঝুঁকি কখনো থাকে অবশ্যই আমরা সেটার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত আছি।”
রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের বিষয়ে সেনাবাহিনীর এখনও ‘সরাসরি কার্যক্রমে’ সম্পৃক্ত হওয়ার ‘প্রয়োজন হয়নি’, বিজিবি বা কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থা বিষয়টি দেখছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা ঢলের শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে ওই এলাকার ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা।
রাখাইনে তীব্র যুদ্ধের তীব্রতায় রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ চলার মধ্যে অগাস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষণা দেয়, ‘আর কোনো রোহিঙ্গাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না’। তবে গত দেড় থেকে দুই বছরে প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশের তথ্য দিয়েছে সরকার।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply